|

পান্তা ভাতের হাজারো গুণাবলী

পান্তা ভাত

শুধু মাত্র বাঙালীয়ানার একটা অংশ হিসেবে পহেলা বৈশাখে পান্তা খেয়ে থাকি। কিন্তু এর গুনাগুণ যদি জানতাম তাহলে হয়তো প্রত্যেকদিনই খেতাম। আজ এই লেখার মাধ্যমে পান্তার গুনাগুণ জানানোর চেষ্টা করবো। কথায় আছে, পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল। হ্যা সত্যি তাই পান্তা শরীরের জন্য খুবই উপকারী। কারণ বলিষ্ঠ শরীর এবং নিজেকে সুষ্ঠু রাখতে পান্তা ম্যাজিকের মত কাজ করে থাকে।

এখনও গ্রামাঞ্চলে পান্তার প্রচলন রয়েছে। তবে শহরাঞ্চলে এই খাবারের প্রচলন নেই বললেই চলে। অথচ পুষ্টিগুণে ভরপুর এই পান্তা ভাত। চিকিৎসকরা বলছেন, জীবনের যাবতীয় শক্তি নাকি পান্তায় রয়েছে। তাদের দাবি, শরীর চর্চা না করেও পান্তা ভাত খেয়ে বলিষ্ঠ শরীর আর উজ্জ্বল ত্বক, চুলের অধিকারী হতে পারেন যে কেউই।জাতীয় জীবনের এই সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে নানা আয়োজনের মধ্যে পান্তা ভাত একটি আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

প্রথম প্রচলন শুরু হয়:-

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেসব অঞ্চলে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয় এবং যেসব দেশের ভাত প্রধান খাবার মূলত সেসব দেশের জলে ভাত ভিজে খাবার সংস্কৃতি চালু আছে । এসব এলাকার আবহাওয়া অত্যন্ত গরম এবং আদ্র হওয়ার কারণে খুব সহজেই ভাত নষ্ট হয়ে যায় । কিন্তু জলে ভিজিয়ে রাখার কারণে এই খাবার দ্রুত নষ্ট হয় না । মূলত সংরক্ষণের কথা বিবেচনা করেই এই পান্তাভাতের প্রচলন শুরু হয়।

পান্তাভাত তৈরীর প্রণালীঃ-

সাধারণত আগের দিন ও রাতের বেঁচে যাওয়া ভাতে জল দিয়ে পান্তা ভাত তৈরি করা হয়। একটি পাত্রের মধ্যে পরিষ্কার জল এবং ভাত একসঙ্গে মিশিয়ে সেটি ঢেকে রাখা হয় । এভাবে দশ বারো ঘন্টা ধরে সারারাত রেখে দেওয়ার ফলে জল এবং ভাতের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় । এ সময় জলের নিচে থাকা ভাত বাতাসে অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসতে পারে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন জলের কারণে ভাতের এই ফারমেন্টেশন বা গাজন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এবং পাত্রের ভেতরে এনারফিক ফারমেন্টেশন এর ঘটনা ঘটে। গবেষকরা বলছেন এই প্রক্রিয়ায় ভাতের মধ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেট ভেঙে যায় এছাড়াও ভাতের মধ্যে ফাইটের যেসব অন্টিনিউট্রিশন ফাক্টেট থাকে সেগুলোও ক্ষয় হয় এবং ভাতও হাইড্রেট হয়ে থাকে, বলে গবেষকরা জানান।

পান্তা ভাতের উপকারিতাঃ-

  • পান্তাভাতে রয়েছে আইসোরহ্যামনেটিন – সেভেন – গ্লুকোসাইড ফ্ল্যাভোনয়েড এর মত মেটাবলাইটস যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • মানবদেহে শরীরের তাপমাত্রার  ভারসাম্য বজায় রাখে ।
  • রক্তচাপ স্বাভাবিক  থাকে এবং হার্ট সুস্থ থাকে।
  • দেহের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে আয়রন যেটা পান্তা ভাতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
  • অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবল হয় এবং মন-মেজাজ ভালো থাকে।
  • অ্যালার্জিজনিত সমস্যা প্রশমিত হয় এবং ত্বক ভালো থাকে।
  •  সব রকম আলসার দূর হয়।
  • শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
  • পেটের সমস্যার সমাধান ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
  • এছাড়াও তারা গবেষণায় দেখেছেন যে পান্তাভাতের প্রচুর পরিমাণে রয়েছে বিটা সিটোস্টেরল, কেম্পেস্টেরল মতো মেটাবলাইটস রয়েছে যার যা শরীরকে প্রদাহ বা যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে।
  • শরীরে হাড়গুলোকে শক্ত রাখে ক্যালসিয়াম। শরীরে নিঃসৃত এনজাইমকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে ম্যাগনেসিয়াম।

ভাত ও পান্তার গুনাগুণে পার্থক্য:-

  • 12 ঘন্টা ভাত ভিজিয়ে রাখলে 100 গ্রাম পান্ত ভাতে 73.91 মিলিগ্রাম আয়রন তৈরি হয়।যেখানে সমপরিমাণ ভাতে আয়রন থাকে মাত্র 3.4 মিলিগ্রাম। 
  • 100 গ্রাম পান্তাভাতে পটাশিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায় 839 মিলিগ্রাম এবং ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায় 850 মিলিগ্রাম।যেখানে সমপরিমাণ ভাতে ক্যালসিয়ামের মাত্রা থেকে মাত্র 21 মিলিগ্রাম।
  • পান্তাভাতের সোডিয়ামের পরিমাণ কমে হয় 303 মিলিগ্রাম সমান। সমপরিমাণ  গরম ভাতে সোডিয়াম থাকে 475 মিলিগ্রাম।
  • পান্তা ভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়ামের পরিমাণ রান্না করা ভাতের তুলনায় বেশি থাকে। অন্যদিকে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে যায়। যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
  • পান্তা ভাতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন b 6 ও ভিটামিন বি ১২ থাকে। যা আমাদের শরীরে উপকারী।
  • পান্তা ভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়ামের পরিমাণ রান্না করা ভাতের তুলনায় অনেক বেশি থাকে।

দেশ-বিদেশ কোথায় কোথায় এখনো পান্তাভাতের প্রচলন রয়েছে:-

পশ্চিমবঙ্গ ,আসাম,বিহার,উড়িষ্যা,দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশে ,কেরালা আমাদের দেশে এই সব রাজ্যে এখনো  পান্তাভাতের প্রচলন রয়েছে।এবং বিদেশে থাইল্যান্ড,মিয়ানমার, চীন, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি প্রান্তে পান্তা ভাতের প্রচলন আছে ।তবে একেক জায়গায় পান্তা ভাতকে একেক নামে ডাকা হয়।

ভারতের আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।মধুমিতা বড়ুয়া জানিয়েছেন, তাদের এই গবেষণা এখনও চলছে। তারা এখন জানার চেষ্টা করছেন পান্তা ভাত ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য ভাল না খারাপ।

মধুমিতা বড়ুয়া আরো বলেছেন, ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ভাতের ফারমেন্টেশন হলে সেখানে অ্যালকোহলের উপাদান তৈরি হয় এবং সেই পান্তা ভাত খাওয়ার পর শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে ও ঘুম পেতে পারে।পান্তা ভাতে কী আছে এবং এসব উপাদান শরীরের জন্য কতোটা উপকারী বা অপকারী সেগুলো খুঁজে বের করা।

এই গবেষণার ফলাফল পরে এশিয়ান জার্নাল অব কেমিস্ট্রিতে প্রকাশিত হয়েছে।

Similar Posts

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.